বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গোলকিপারদের যেভাবে ধোঁকা দেন মেসি-এমবাপে-কেইনরা

নিজস্ব প্রতিবেদক:
  • প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬। ৪:৩১:৫৯ এএম

গোলকিপারদের জন্য ফুটবলের সবচেয়ে কঠিন কাজ কী? শক্তিশালী শট থামানো? নাকি পেনাল্টি বাঁচানো? আসলে তারও আগে শুরু হয় আরেকটি লড়াই, মনের লড়াই। ম্যাচের আগে একজন গোলকিপার শুধু দেখেন না কোন স্ট্রাইকার কোন কোণে শট নিতে পছন্দ করেন। তিনি খুঁজে বের করেন অভ্যাস। বল পাওয়ার আগে স্ট্রাইকার কতবার গোলকিপারের দিকে তাকান, শট নেওয়ার আগে শরীর কীভাবে ঘোরান, দ্রুত শট নেন নাকি অপেক্ষা করেন, কোন পোস্ট লক্ষ্য করেন, নাকি শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেন। এসব তথ্য মিলিয়েই তৈরি হয় প্রতিপক্ষকে থামানোর পরিকল্পনা।

কিন্তু বিশ্বকাপের সেরা ফরোয়ার্ডরা ঠিক এই পরিকল্পনাটাকেই ভেঙে দেন। এবারের বিশ্বকাপে গোলের বন্যা বইয়ে দিয়েছেন লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপে। দুজনেরই গোল ৮টি। তাদের সঙ্গে হ্যারি কেইন, উসমান দেম্বেলে ও মিকেল ওইয়ারসাবালের মতো ফরোয়ার্ডরা গোলকিপারদের জন্য হয়ে উঠেছেন একেকটি দুঃস্বপ্ন।

 

কিলিয়ান এমবাপের সবচেয়ে বড় অস্ত্র শুধু তার গতি নয়, বরং শট নেওয়ার অবিশ্বাস্য দ্রুততা। অধিকাংশ ফরোয়ার্ড শট নেওয়ার আগে পা পেছনে নিয়ে শক্তি সঞ্চয় করেন। সেই মুহূর্তেই গোলকিপার বুঝে ফেলেন কখন ঝাঁপ দিতে হবে। কিন্তু এমবাপে প্রায় কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই বলে আঘাত করেন। ফলে গোলকিপার বুঝে ওঠার আগেই বল জালে পৌঁছে যায়। মরক্কোর বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে ইয়াসিন বুনুকে তিনি ঠিক এভাবারেই অসহায় করে দিয়েছিলেন। এমবাপের বিরুদ্ধে গোলকিপারদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, খুব বেশি এগিয়েও যাওয়া যাবে না, আবার বেশি পিছিয়েও থাকা যাবে না। কারণ এক মুহূর্তের ভুল সিদ্ধান্তই গোল ডেকে আনে।

 

উসমান দেম্বেলের বিপক্ষে আরেক ধরনের সমস্যা। সাধারণত বাঁ-পায়ের ফুটবলারকে ডান দিকে ঠেলে দিলে বা ডান-পায়ের ফুটবলারকে বাঁ দিকে পাঠালে কিছুটা সুবিধা মেলে। কিন্তু দেম্বেলের ক্ষেত্রে সেই কৌশল অর্থহীন। দুই পায়েই সমান দক্ষ এই ফরাসি উইঙ্গার যেকোনো কোণ থেকে, যেকোনো পায়ে সমান নিখুঁত ফিনিশ করতে পারেন। নরওয়ের বিপক্ষে তার হ্যাটট্রিকই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তিনটি গোল এসেছে তিন রকম পরিস্থিতি থেকে, তিন ধরনের ফিনিশে। ফলে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গোলকিপার বুঝতেই পারেন না তিনি কী করতে যাচ্ছেন।

লিওনেল মেসির গল্প আবার একেবারেই ভিন্ন। প্রায় দুই দশক ধরে সবাই জানে, তিনি বলটা বাঁ পায়ে এনে দূরের পোস্টে কার্ব করবেন। তবু তাকে থামানো যায় না। কারণ মেসি শুধু ডিফেন্ডারকে নয়, প্রতিটি মুহূর্তে গোলকিপারকেও পড়তে থাকেন। গোলকিপার এক পা এগোলেন কি না, একটু ঝুঁকলেন কি না, কোন পোস্ট ঢাকার চেষ্টা করছেন, এই ক্ষুদ্রতম পরিবর্তনও তার নজর এড়ায় না। গোলকিপার যখন অনুমান করতে শুরু করেন, ঠিক তখনই মেসি সিদ্ধান্ত বদলে দেন। কখনও কার্বিং শট, কখনও চিপ, কখনও নিচু প্লেসিং। বল সব সময় এত কাছাকাছি রাখেন যে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বোঝা যায় না তিনি শট নেবেন, নাকি আরেকটি টাচ দেবেন। এই অনিশ্চয়তাই মেসির সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

 

হ্যারি কেইনকে সামলানোও সহজ নয়। কারণ তিনি যেন এক শরীরে দুই ফুটবলার। কখনও বক্সের ভেতরে খাঁটি স্ট্রাইকার, আবার কখনও ২০ গজ নিচে নেমে খেলা গড়ে তোলেন। তিনি গোল করতে পারেন দুই পায়েই, হেডে, দূরপাল্লার শটে, সেট পিসে কিংবা প্রথম স্পর্শেই। আরও বড় ব্যাপার হলো, কেইন প্রায়ই ডিফেন্ডারদের শরীর আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে শট নেন। ফলে গোলকিপার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বল দেখতে পান না। এর মধ্যেই বল ছুটে যায় জালের দিকে। ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে তার জয়সূচক গোলেও এই গুণটি স্পষ্ট ছিল।

 

স্পেনের মিকেল ওইয়ারসাবাল হয়তো সবচেয়ে চোখধাঁধানো নন, কিন্তু সবচেয়ে বুদ্ধিমানদের একজন। স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে তাকে নিজের দেখা অন্যতম বুদ্ধিমান ফুটবলার বলেছেন। ওইয়ারসাবাল কখনও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকেন না। কখনও মাঝমাঠে নামেন, কখনও উইংয়ে চলে যান, কখনও হাফ-স্পেসে, আবার হঠাৎ করেই ডিফেন্ডারদের মাঝখানে হাজির হন। তার এই নড়াচড়া গোলকিপারকে প্রতি মুহূর্তে নতুন করে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে বাধ্য করে। আর ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় পৌঁছে প্রথম স্পর্শেই ফিনিশ করার ক্ষমতা তাকে আরও ভয়ংকর করে তোলে।

গোলকিপারদের কাজ সবসময়ই অনিশ্চয়তা কমিয়ে আনা। কিন্তু এমবাপ্পে, দেম্বেলে, মেসি, কেইন কিংবা ওইয়ারসাবালদের মতো বিশ্বমানের ফরোয়ার্ডরা ঠিক উল্টো কাজটাই করেন। তারা প্রতিটি মুহূর্তে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেন, নতুন সন্দেহ সৃষ্টি করেন। আর গোলকিপারের মনে একবার সেই সন্দেহ ঢুকে পড়লেই, ম্যাচের ভাগ্য বদলে যেতে সময় লাগে মাত্র একটি স্পর্শ।

 

খেলা | ১৪ জুলাই ২০২৬

গোলকিপারদের যেভাবে ধোঁকা দেন মেসি-এমবাপে-কেইনরা

বিস্তারিত | dainikamarnews.com
বিষয় :

গোলকিপারদের যেভাবে ধোঁকা দেন মেসি-এমবাপে-কেইনরা

Update Time : ০৪:৩১:৫৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

গোলকিপারদের জন্য ফুটবলের সবচেয়ে কঠিন কাজ কী? শক্তিশালী শট থামানো? নাকি পেনাল্টি বাঁচানো? আসলে তারও আগে শুরু হয় আরেকটি লড়াই, মনের লড়াই। ম্যাচের আগে একজন গোলকিপার শুধু দেখেন না কোন স্ট্রাইকার কোন কোণে শট নিতে পছন্দ করেন। তিনি খুঁজে বের করেন অভ্যাস। বল পাওয়ার আগে স্ট্রাইকার কতবার গোলকিপারের দিকে তাকান, শট নেওয়ার আগে শরীর কীভাবে ঘোরান, দ্রুত শট নেন নাকি অপেক্ষা করেন, কোন পোস্ট লক্ষ্য করেন, নাকি শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেন। এসব তথ্য মিলিয়েই তৈরি হয় প্রতিপক্ষকে থামানোর পরিকল্পনা।

কিন্তু বিশ্বকাপের সেরা ফরোয়ার্ডরা ঠিক এই পরিকল্পনাটাকেই ভেঙে দেন। এবারের বিশ্বকাপে গোলের বন্যা বইয়ে দিয়েছেন লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপে। দুজনেরই গোল ৮টি। তাদের সঙ্গে হ্যারি কেইন, উসমান দেম্বেলে ও মিকেল ওইয়ারসাবালের মতো ফরোয়ার্ডরা গোলকিপারদের জন্য হয়ে উঠেছেন একেকটি দুঃস্বপ্ন।

 

কিলিয়ান এমবাপের সবচেয়ে বড় অস্ত্র শুধু তার গতি নয়, বরং শট নেওয়ার অবিশ্বাস্য দ্রুততা। অধিকাংশ ফরোয়ার্ড শট নেওয়ার আগে পা পেছনে নিয়ে শক্তি সঞ্চয় করেন। সেই মুহূর্তেই গোলকিপার বুঝে ফেলেন কখন ঝাঁপ দিতে হবে। কিন্তু এমবাপে প্রায় কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই বলে আঘাত করেন। ফলে গোলকিপার বুঝে ওঠার আগেই বল জালে পৌঁছে যায়। মরক্কোর বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে ইয়াসিন বুনুকে তিনি ঠিক এভাবারেই অসহায় করে দিয়েছিলেন। এমবাপের বিরুদ্ধে গোলকিপারদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, খুব বেশি এগিয়েও যাওয়া যাবে না, আবার বেশি পিছিয়েও থাকা যাবে না। কারণ এক মুহূর্তের ভুল সিদ্ধান্তই গোল ডেকে আনে।

 

উসমান দেম্বেলের বিপক্ষে আরেক ধরনের সমস্যা। সাধারণত বাঁ-পায়ের ফুটবলারকে ডান দিকে ঠেলে দিলে বা ডান-পায়ের ফুটবলারকে বাঁ দিকে পাঠালে কিছুটা সুবিধা মেলে। কিন্তু দেম্বেলের ক্ষেত্রে সেই কৌশল অর্থহীন। দুই পায়েই সমান দক্ষ এই ফরাসি উইঙ্গার যেকোনো কোণ থেকে, যেকোনো পায়ে সমান নিখুঁত ফিনিশ করতে পারেন। নরওয়ের বিপক্ষে তার হ্যাটট্রিকই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তিনটি গোল এসেছে তিন রকম পরিস্থিতি থেকে, তিন ধরনের ফিনিশে। ফলে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গোলকিপার বুঝতেই পারেন না তিনি কী করতে যাচ্ছেন।

লিওনেল মেসির গল্প আবার একেবারেই ভিন্ন। প্রায় দুই দশক ধরে সবাই জানে, তিনি বলটা বাঁ পায়ে এনে দূরের পোস্টে কার্ব করবেন। তবু তাকে থামানো যায় না। কারণ মেসি শুধু ডিফেন্ডারকে নয়, প্রতিটি মুহূর্তে গোলকিপারকেও পড়তে থাকেন। গোলকিপার এক পা এগোলেন কি না, একটু ঝুঁকলেন কি না, কোন পোস্ট ঢাকার চেষ্টা করছেন, এই ক্ষুদ্রতম পরিবর্তনও তার নজর এড়ায় না। গোলকিপার যখন অনুমান করতে শুরু করেন, ঠিক তখনই মেসি সিদ্ধান্ত বদলে দেন। কখনও কার্বিং শট, কখনও চিপ, কখনও নিচু প্লেসিং। বল সব সময় এত কাছাকাছি রাখেন যে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বোঝা যায় না তিনি শট নেবেন, নাকি আরেকটি টাচ দেবেন। এই অনিশ্চয়তাই মেসির সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

 

হ্যারি কেইনকে সামলানোও সহজ নয়। কারণ তিনি যেন এক শরীরে দুই ফুটবলার। কখনও বক্সের ভেতরে খাঁটি স্ট্রাইকার, আবার কখনও ২০ গজ নিচে নেমে খেলা গড়ে তোলেন। তিনি গোল করতে পারেন দুই পায়েই, হেডে, দূরপাল্লার শটে, সেট পিসে কিংবা প্রথম স্পর্শেই। আরও বড় ব্যাপার হলো, কেইন প্রায়ই ডিফেন্ডারদের শরীর আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে শট নেন। ফলে গোলকিপার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বল দেখতে পান না। এর মধ্যেই বল ছুটে যায় জালের দিকে। ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে তার জয়সূচক গোলেও এই গুণটি স্পষ্ট ছিল।

 

স্পেনের মিকেল ওইয়ারসাবাল হয়তো সবচেয়ে চোখধাঁধানো নন, কিন্তু সবচেয়ে বুদ্ধিমানদের একজন। স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে তাকে নিজের দেখা অন্যতম বুদ্ধিমান ফুটবলার বলেছেন। ওইয়ারসাবাল কখনও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকেন না। কখনও মাঝমাঠে নামেন, কখনও উইংয়ে চলে যান, কখনও হাফ-স্পেসে, আবার হঠাৎ করেই ডিফেন্ডারদের মাঝখানে হাজির হন। তার এই নড়াচড়া গোলকিপারকে প্রতি মুহূর্তে নতুন করে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে বাধ্য করে। আর ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় পৌঁছে প্রথম স্পর্শেই ফিনিশ করার ক্ষমতা তাকে আরও ভয়ংকর করে তোলে।

গোলকিপারদের কাজ সবসময়ই অনিশ্চয়তা কমিয়ে আনা। কিন্তু এমবাপ্পে, দেম্বেলে, মেসি, কেইন কিংবা ওইয়ারসাবালদের মতো বিশ্বমানের ফরোয়ার্ডরা ঠিক উল্টো কাজটাই করেন। তারা প্রতিটি মুহূর্তে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেন, নতুন সন্দেহ সৃষ্টি করেন। আর গোলকিপারের মনে একবার সেই সন্দেহ ঢুকে পড়লেই, ম্যাচের ভাগ্য বদলে যেতে সময় লাগে মাত্র একটি স্পর্শ।

 

খেলা | ১৪ জুলাই ২০২৬

গোলকিপারদের যেভাবে ধোঁকা দেন মেসি-এমবাপে-কেইনরা

বিস্তারিত | dainikamarnews.com