বিএনপির স্থানীয় নির্বাচন পরীক্ষা
- প্রকাশিত : রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬। ৪:১২:১৪ এএম
তফসিল ঘোষণা না হলেও আগামী অক্টোবর-নভেম্বরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই নির্বাচনে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় ইতোমধ্যে মাঠে নেমেছে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি। জামায়াত সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে তাদের প্রার্থী ঘোষণা করে মাঠে নামিয়েছে। তারা নিজ নিজ এলাকায় জনসংযোগও করছেন। একইভাবে এনসিপিও তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। কিন্তু ক্ষমতাসীন দল বিএনপি এক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। দলটি এখনো এই নির্বাচন নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোন ধরনের কার্যক্রম শুরু করেনি। তবে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে অংশগ্রহণে আগ্রহী একাধিক প্রার্থী মাঠে রয়েছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল বিএনপিকে বেশ চ্যালেঞ্জের মুখেই পড়তে হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে নির্বাচন পরবর্তী সময়ে ত্যাগী নেতাকর্মীদের নিষ্ক্রিয়তা, একক প্রার্থী রাখা, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের জোটসঙ্গীদের সঙ্গে দূরত্ব, ইসলামী দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা না করা এবং জামায়াত ও এনসিপির জোটবদ্ধ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা বিএনপির জন্য মাঠের রাজনীতিতে আধিপত্য ধরে রাখার নতুন পরীক্ষা।
যদিও বিএনপির নীতিনির্ধারণী নেতারা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও নিরঙ্কুশ বিজয়ের বিষয়ে আশাবাদী। তারা বলেন, ইতোমধ্যে স্থানীয় নেতাকর্মীরা যার যার মতো করে সাধারণ মানুষের কাছে যাচ্ছেন এবং নির্বাচনের অনানুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করেছেন। দলও সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে এবং খোঁজ-খবর নিচ্ছে। এবারের নির্বাচন যেহেতু নির্দলীয় এবং দলীয় প্রকীক ছাড়া হবে ফলে জাতীয় নির্বাচনের মতো দলীয়ভাবে তেমন সরাসরি প্রভাব থাকবে না। তবে যেখানে যার জনপ্রিয়তা বেশি এবং বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকবে সেখানে তাকেই দলের পক্ষ থেকে সমর্থন দেয়া হবে। সবকিছুই হবে তফসিল ঘোষণার পর।
তৃণমূল পুনর্গঠন ও কর্মী চাঙ্গা করা:
নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করা পর বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে অসংখ্য নেতাকর্মীর। বিষয়টি নিয়ে অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ফলে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী ইতোমধ্যেই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। এই নির্বাচনের তাদেরকে চাঙ্গা করে তোলা দলটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আবার দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির যেসব কেন্দ্রীয় নেতাকর্মী তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন তারাও এখন অনেকটা নিরব। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির অনেক শীর্ষ ও মধ্যম সারির নেতা সরকার পরিচালনায় যুক্ত হয়েছেন। ফলে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে দল এখন তৃণমূলকে চাঙা করতে হচ্ছে। একইভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের বিজয়ের পর তৃণমূলের জনসমর্থন কতটা অক্ষুণœ রয়েছে এবং আওয়ামী লীগ-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি নিজেদের কতটা জনপ্রিয় রাখতে পেরেছে, তা যাচাইয়ের একটি বড় মাধ্যম এই স্থানীয় নির্বাচন।
জামায়াতে ইসলামীর সাথে ত্রিমুখী লড়াই:
বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হওয়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও স্থানীয় নির্বাচনে কোমর বেঁধে নামছে। অনেক এলাকায় বিএনপির প্রার্থীদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়াবেন জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীরা। আবার বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের মাঠে রাখার জন্য জামায়াত ইতোমধ্যে কৌশলগত প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলেও জানা যাচ্ছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে ভোট ভাগাভাগি এবং ত্রিমুখী বা দ্বিমুখী তীব্র লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হবে বিএনপিকে।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এড. সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে এখনো দলে কোন আলোচনা হয়নি। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলে তখন প্রার্থীসহ অন্যান্য বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। এখন অনেকেই প্রার্থী হতে চায়, দল নিশ্চয় জনপ্রিয় এবং বিজয়ী হতে পারে এমন প্রার্থীকেই সমর্থন দেবে।
বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এবারের নির্বাচন হবে নির্দলীয়। এখানে কোন দলীয় প্রতীক থাকবে না। তাই দলীয়ভাবে প্রার্থী ঘোষণা বা আনুষ্ঠানিকতার কোন সুযোগ নেই। তবে দলের যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন তাদের বিজয়ের ব্যাপারে তিনি আশাবাদী।
অন্যদিকে তফসিল ঘোষণার আগেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের অনানুষ্ঠানিক প্রস্তুতি শুরু করেছে জামায়াতে ইসলামী। দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলটির এই তৎপরতা চলছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, দলীয়ভাবে অংশ না নিলেও দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে আটটিতে মেয়র প্রার্থী প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মেয়র প্রার্থী হিসেবে দলের মহানগর উত্তর শাখার আমির সেলিম উদ্দিনের নাম চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কয়েম। এ ছাড়া চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে নগর জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক কাউন্সিলর মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালী, গাজীপুর সিটি করপোরেশনে তুরস্কের গাজী উসমান পাশা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী অধ্যাপক হাফিজুর রহমান, বরিশাল সিটি করপোরেশনে দলের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুয়াযযম হোসাইন হেলাল, রংপুর সিটি করপোরেশনে মহানগর জামায়াতের আমির এ টি এম আজম খান, খুলনা সিটি করপোরেশনে কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা মহানগরীর আমির মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে মহানগর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ আবদুল জব্বারের নাম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
জামায়াত সূত্র বলছে, এসব সম্ভাব্য প্রার্থী ইতোমধ্যে নিজ নিজ এলাকায় সামাজিক, জনকল্যাণমূলক ও গণসংযোগমূলক কার্যক্রমে সক্রিয় রয়েছেন। তারা বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। তরুণ নেতৃত্বকে প্রাধান্য দিয়ে দল এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার এই প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।
গতকাল মগবাজারের আল ফালাহ মিলনায়তনে দলের জেলা মহানগরী কর্মপরিষদ সদস্যদের এক কর্মশালায় জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান স্থানীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে সমাজ থেকে ভালো মানুষগুলোকে বাছাই করে নিতে হবে। প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মানবিক যোগ্যতাসম্পন্নদের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে যারা হালাল উপার্জন এবং সমাজে গ্রহণযোগ্যতা ও নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা রাখেন, তাকেই বাছাই করতে হবে; তিনি যে স্তরের জনশক্তিই হোন না কেন। এর মাধ্যমে সেখানে দায়িত্বশীল তৈরি হবে।
জাতীয় | ৫ জুলাই ২০২৬
বিএনপির স্থানীয় নির্বাচন পরীক্ষা






















