ঋণখেলাপির পাহাড় রেখে গেলো কারা, দায় দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে কার ওপর?
- প্রকাশিত : শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ৯:২৩:১৮ এএম
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ এখন আর নিছক একটি আর্থিক পরিসংখ্যান নয়; এটি অর্থনীতির গভীরে জমে থাকা দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল ঋণশাসন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং অতীতের ব্যাংক ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার একটি দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি। অথচ এই সংকটের দায় নিয়েও শুরু হয়েছে নতুন এক রাজনৈতিক বয়ান—‘বিএনপি ক্ষমতায় এসেই বাংলাদেশকে ঋণখেলাপিতে রেকর্ডের দেশে পরিণত করেছে!’
বয়ানটি রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হতে পারে, কিন্তু অর্থনীতির হিসাবে মিথ্যা ও উদ্ভট। কেবল আওয়ামী লীগ এবং অন্তর্বর্তী সরকারকে বাঁচাতে বিএনপির ওপর দায় চাপানোর পাঁয়তারা মাত্র।
কারণ খেলাপি ঋণের হিসাব এ সরল নয়। ব্যাংকের ঋণ আজ দেওয়া হলো, আর কাল সকালেই সেটি লাখ লাখ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে গেল—বাস্তবে ব্যাংকিং ব্যবস্থা এভাবে কাজ করে না।
একটি ঋণ খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকৃত হওয়ার পেছনে থাকে দীর্ঘ প্রক্রিয়া, নির্ধারিত সময়সীমা, কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থতা, পুনঃতফসিল, অবলোপনসহ নানা আর্থিক ও নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া।
তাই বর্তমানের খেলাপি ঋণের অঙ্ককে বুঝতে হলে শুধু আজকের সংখ্যাটি দেখলে হবে না; দেখতে হবে ঋণটি কখন দেওয়া হয়েছিলো, কারা দিয়েছিলো, কীভাবে অনুমোদিত হয়েছিলো, কতদিন ধরে অনাদায়ী ছিলো এবং কোন সময়ে সেটি খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকৃত হয়েছে।
সেই হিসেবে এই বিশাল খেলাপি ঋণ ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে যা কাচের মতো স্বচ্ছ।
বাংলাভিশনের গুগল নিউজ ফলো করতে ক্লিক করুন
গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই একটি ধারাবাহিক চিত্র পাওয়া যায়-
২০২১ সালে খেলাপি ঋণ ছিলো ১ লাখ ৩ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা।
২০২২ সালে তা বেড়ে হয় ১ লাখ ২০ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা।
২০২৩ সালে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা।
আর আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে, জুন ২০২৪-এ খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। অর্থাৎ সরকার পরিবর্তনের আগেই খেলাপি ঋণের পাহাড় দুই লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছিলো। এরপর প্রকাশ্যে আসতে থাকে আরও বড় অঙ্ক—
ডিসেম্বর ২০২৪-এ খেলাপি ঋণ প্রায় ৩ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ২০ দশমিক ২০ শতাংশ।
ডিসেম্বর ২০২৫-এ তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা, অর্থাৎ মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।
আর মার্চ ২০২৬-এ শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ।
খেলাপি ঋণের পরিমাণ লুকানো
সংখ্যাগুলো ভয়াবহ—এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু তার চেয়েও মারাত্মক ব্যাপার ছিলো আওয়ামী লীগের খেলাপি ঋণের তথ্য লুকানো। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ২০২৪ সালের জুন মাসে প্রকাশিত স্বেতপত্রে দেখা গেছে, ওই বছরের জুন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের খেলাপি ঋণের চিত্র ছিলো ৬ লাখ ৭৫ হাজার ৩০ কেটি টাকা। দেখা গেছে আইএমএফ এর শর্ত ও প্রকৃত হিসাবের বাইরেও বিপুল পরিমাণ ঋণ লুকিয়ে রাখা হয়েছিলো। ওই স্বেতপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩১.৭ শতাংশ থেকে ৩৪.৬ শতাংশ ঋণই প্রকৃতপক্ষে খেলাপি বা দুর্দশাগ্রস্ত ছিলো।
তবে শ্রেণিকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ কিছুটা কম হলেও মূল বিতর্ক অন্য জায়গায়। এই পুরো অঙ্কই আগের দুই সরকারের আমলের। নতুন সরকারের সময়ে তেমন উল্লেখযোগ্য খেলাপি ঋণের সংখ্যা নেই। পুরোনো অনিয়ম, গোপন ক্ষত ও দীর্ঘদিনের অনাদায়ী ঋণ নতুন করে হিসাবের খাতায় দৃশ্যমান হয়েছে। তার মানে এই খেলাপি ঋণ এই সরকারের নয়।
এই প্রশ্নটি এড়িয়ে গেলে পরিসংখ্যান থাকে, কিন্তু প্রকৃত অর্থনৈতিক সত্যটি থাকে না। যা দায়ীদের দায় দেওয়ার পরিবর্তে তাদের বাঁচাতে অন্যদের ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়ার কৌশল মাত্র।
হিসাবের খাতায় নতুন, ঋণের ইতিহাসে পুরোনো
সরকার পরিবর্তনের পর ব্যাংকিং খাতে ঋণ শ্রেণিকরণের ক্ষেত্রে কঠোরতা এসেছে, পুরোনো অনিয়ম সামনে এসেছে, বড় ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পুনর্মূল্যায়ন হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে এস আলম, বেক্সিমকো, অ্যাননটেক্স, নাসা, সিকদারসহ একাধিক বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিপুল ঋণ খেলাপি হওয়ার তথ্য সামনে এসেছে।
এখানেই মূল প্রশ্নটি। কোনো ঋণ যদি বহু বছর আগে দেওয়া হয়ে থাকে, বছরের পর বছর তা অনাদায়ী থাকে, কিন্তু পরে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোরতায় সেটি খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকৃত হয়—তাহলে খাতায় খেলাপি হওয়ার তারিখ এবং ঋণটি সৃষ্টির সময়কে এক করে দেখা কি অর্থনৈতিকভাবে সঠিক? অবশ্যই নয়।
ধরা যাক, একটি রোগ বহুদিন শরীরে ছিলো। নতুন চিকিৎসক এসে পরীক্ষা করিয়ে রোগটি শনাক্ত করলেন। তখন কি বলা যাবে—‘নতুন চিকিৎসকই রোগটি সৃষ্টি করেছেন, কারণ তার সময়েই রিপোর্টে রোগ ধরা পড়েছে?’
খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রেও যুক্তিটি অনেকটা একই। থার্মোমিটারে জ্বর ধরা পড়েছে বলে থার্মোমিটারকে জ্বরের কারণ বানানো যায় না।
তবে কি নতুন সরকার দায়মুক্ত? একেবারেই নয়। এখানেই আলোচনাকে রাজনৈতিক স্লোগান থেকে অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে ফিরিয়ে আনা জরুরি।
বর্তমান সরকার যদি পুরোনো খেলাপি ঋণ উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়, নতুন করে অনিয়মিত ঋণ বিতরণ বন্ধ করতে না পারে, ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব কমাতে না পারে, কিংবা ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়—তাহলে সেই ব্যর্থতার দায় বর্তমান সরকারকে দেওয়া যায়। এর বাইরে দায় দেয়ার চেষ্টা এক ধরনের অপরাজনীতিই।
উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সংকট দায় হিসেবে চাপানো ঠিক নয়
উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সংকটকে ‘নতুন সরকারের সৃষ্ট সংকট’ হিসেবে উপস্থাপন করাও তথ্যের সঙ্গে সুবিচার নয়। দায় নির্ধারণ করতে হলে সময়ের রেখা দেখতে হবে—
ঋণ কখন দেওয়া হয়েছিলো?
কার অনুমোদনে দেওয়া হয়েছিলো?
কী জামানতে দেওয়া হয়েছিলো?
কে সুবিধা পেয়েছিলো?
কতোদিন ঋণ অনাদায়ী ছিলো?
কোন সময়ে পুনঃতফসিল হয়েছে?
কখন খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকৃত হয়েছে?
এবং শেষ পর্যন্ত টাকা উদ্ধারে কে কী করেছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া শুধু একটি বছরের খেলাপি ঋণের অঙ্ক তুলে ধরে রাজনৈতিক দায় নির্ধারণ করা মূলত হিসাবের নির্বাচিত পাঠ।
‘দুর্নীতিতে পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন’—এই বয়ান পুরোনো এবং অন্যের দায় চাপিয়ে দেওয়ার সংস্করণ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিতর্কে পরিসংখ্যানকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের ইতিহাস নতুন নয়। ‘দুর্নীতিতে পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন’—এই বাক্যটিও বহু বছর ধরে এমনভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, যেনো পাঁচবারের পুরো দায় একটি নির্দিষ্ট সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া যায়। তবে বাস্তবতা একটু বেশিই জটিল।
Transparency International-এর দুর্নীতি উপলব্ধি সূচকের ইতিহাসে বাংলাদেশ প্রথমবার সর্বনিম্ন অবস্থানে আসে ২০০১ সালে—যে বছর আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদ শেষ হয়। বরং দুর্নীতি সূচকের সেই তলানি থেকে তারপরের পাঁচ বছর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থেকে এই সূচক তলানি থেকে বেশ কিছু উপরে নিয়ে এসেছিলো। এমনকি ওই মেয়াদে বিএনপি ক্ষমতা ছাড়ার সময় ২০০৬ সালে এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিলো তৃতীয়।
অর্থাৎ এখানেও সত্য গোপন করে মিথ্যা স্লোগান চালিয়েছে আওয়ামী লীগ। আর যা এখনও তাদেরই অনেক আপনজনেরা বুলি আওড়িয়ে বেড়াচ্ছে।
একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার। কোনো সরকারের আমলে সূচক প্রকাশিত হওয়া আর সেই সরকারের আমলেই সংশ্লিষ্ট সব ব্যর্থতার জন্ম হওয়া—দুটি এক জিনিস নয়।
রাজনৈতিক বয়ান নয়, চাই দায়ের সঠিক হিসাব
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সংকট এতো গভীর যে এটি নিয়ে দলীয় দোষারোপের প্রতিযোগিতা অর্থনীতির কোনো সমাধান দেবে না।
যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, ব্যাংকের টাকা জনগণের টাকা। খেলাপি ঋণের বোঝা শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনোভাবে সাধারণ আমানতকারী, করদাতা এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর এসে পড়ে।
তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত—
কার সময়ে কতো ঋণ বিতরণ হয়েছে?
কোন ব্যাংক কতো বড় ঋণ দিয়েছে?
কোন ঋণ রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবের কারণে অনুমোদিত হয়েছে?
কতো টাকা পুনঃতফসিলের আড়ালে আটকে ছিলো?
কতো টাকা প্রকৃতপক্ষে আদায়যোগ্য?
এবং কার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
এই তথ্যভিত্তিক অডিটই বলে দেবে প্রকৃত দায় কার কতোটা? কারণ খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় শুধু অঙ্কটি বড় হওয়া নয়; বরং অঙ্কের সঙ্গে দায়ের ইতিহাসটি মুছে ফেলা। সেটিরই চেষ্টা করছে স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের লোকজন।
আজকের পাঁচ লাখ, ছয় লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ কোনো এক সকালবেলার ঘটনা নয়। এর পেছনে আছে বহু বছরের সিদ্ধান্ত, ঋণ অনুমোদন, তদারকির ব্যর্থতা, পুনঃতফসিল, প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতা এবং নীতিগত দুর্বলতার দীর্ঘ ইতিহাস।
সুতরাং আজকের সরকারের দায়িত্ব হলো এই উত্তরাধিকার মোকাবিলা করা। আর আগের সরকারের দায়িত্ব—যদি তাদের সময়ে এসব অনিয়মের ভিত্তি তৈরি হয়ে থাকে—তা অস্বীকার না করা।
দায় নির্ধারণে ক্যালেন্ডার নয়, কারণের ইতিহাস দেখতে হবে। রাজনীতির বয়ানের জন্য যদি পুরোনো ঋণকে নতুন ঋণ, পুরোনো দায়কে নতুন দায় এবং পুরোনো ব্যর্থতাকে নতুন সরকারের সৃষ্ট সংকট হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে আমরা হয়তো রাজনৈতিক তর্কে জিতবো—কিন্তু অর্থনীতির প্রকৃত সত্যকে হারাবো।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এখন স্লোগান চায় না। চায় ফরেনসিক হিসাব। চায় জবাবদিহি। চায় ঋণদাতার পরিচয়, ঋণগ্রহীতার পরিচয় এবং দায় নির্ধারণের স্বচ্ছ প্রক্রিয়া।
কারণ প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত খুবই সরল—
ঋণখেলাপির পাহাড় এক দিনে তৈরি হয়নি। তাহলে দায়টা এক দিনের সরকারকে দিয়ে মিটবে কীভাবে?
হিসাব নিয়ে রাজনীতি নয়।
আগে হিসাবটা ঠিকমতো পড়ুন। তারপর দায় যার, তার ঘাড়েই চাপান।
লেখক: প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব
জাতীয় | ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ঋণখেলাপির পাহাড় রেখে গেলো কারা, দায় দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে কার ওপর?
























