ফুটপাতের খাবারের দোকানও আসছে নিবন্ধনের আওতায়
- প্রকাশিত : বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬। ১২:২৮:৩৯ পিএম
রাজধানীর লালবাগের একটি গলিতে ছোট্ট দোকানে পিঠা ও নাশতার জন্য অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করেন সোহেল। প্রতিদিন সকালে দোকান খুলে বিকেল পর্যন্ত খাবার বিক্রি করেন তিনি। দোকানের আয় দিয়েই চলে তার সংসার। খাবারের দোকানের জন্য বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) নিবন্ধন বা লাইসেন্স নেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে কি না, তা জানেন না তিনি।
একই অবস্থা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার খাবার বিক্রেতা আনোয়ারের। ফুটপাতে খাবার বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি। নতুন কোনো নিয়মের আওতায় তাদের দোকান পড়বে কি না, সে বিষয়ে তার ধারণা নেই। আজিমপুরের খাবার বিক্রেতা রাইসুলও জানেন না, খাবারের ব্যবসা চালাতে এখন থেকে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিবন্ধন নিতে হবে।
অথচ নতুন প্রবিধান অনুযায়ী, রাস্তার পাশের অস্থায়ী খাবারের দোকান থেকে শুরু করে রেস্তোরাঁ, বেকারি, মিষ্টির দোকান, খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও নির্ধারিত শ্রেণির আমদানিকারকদের নিবন্ধন বা লাইসেন্সের আওতায় আনা হচ্ছে। আগামী ১ নভেম্বর থেকে এজন্য আবেদন গ্রহণের কথা জানিয়েছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ।
খাদ্য ব্যবসার একটি বড় অংশকে নিবন্ধনের আওতায় আনার এই উদ্যোগের লক্ষ্য— নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য সংরক্ষণ এবং তদারকির আওতা বাড়ানো। তবে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের শুরুতেই প্রশ্ন তৈরি করছে মাঠপর্যায়ে নতুন নিয়ম সম্পর্কে বিক্রেতাদের অজ্ঞতা। বিশেষ করে, ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কীভাবে নিবন্ধন করবেন, তাদের কী কী কাগজপত্র লাগবে, কীভাবে আবেদন করতে হবে এবং নিয়ম না মানলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা না থাকলে নতুন বিধান তাদের জন্য বাড়তি জটিলতা তৈরি করতে পারে।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা বলছেন, শুরুতেই অভিযান চালিয়ে ব্যবসায়ীদের শাস্তির আওতায় নেওয়া হবে না। প্রথমে আইন সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির জন্য প্রচার, লিফলেট বিতরণ ও গণমাধ্যমে প্রচার চালানো হবে। এরপর ব্যবসায়ীদের প্রস্তুতির জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় দেওয়া হবে। সেই সময় শেষ হলে অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
গত ১৬ জুলাই ‘নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা, ২০২৬’ সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়। নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর আওতায় প্রণীত এই প্রবিধানমালায় নির্ধারিত শ্রেণির খাদ্য ব্যবসা ও খাদ্যপণ্যের জন্য নিবন্ধন এবং লাইসেন্স গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
প্রবিধানমালায় ১৬ শ্রেণির খাদ্য ব্যবসা ও খাদ্য স্থাপনার জন্য নিবন্ধনের বিধান রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— রেস্তোরাঁ, বেকারি, পেস্ট্রি শপ, ফলের রসের দোকান, ক্যাটারিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, মিষ্টির দোকান, দুগ্ধজাত পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এবং মোড়কজাত খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। এছাড়া, পাইকারি মুদি খাদ্য ব্যবসা, খাদ্য সংরক্ষণাগার ও কোল্ড স্টোরেজ এবং নির্ধারিত শ্রেণির খাদ্য আমদানি, উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, মজুত, রপ্তানি ও বিপণন কার্যক্রমও এই ব্যবস্থার আওতায় আসবে।
অন্যদিকে, বিশেষায়িত খাদ্যপণ্যের উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, মজুত, আমদানি ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত নির্ধারিত ব্যবসার জন্য লাইসেন্সের বিধান রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য সহায়ক ও সম্পূরক খাদ্য, বিশেষ পথ্য, চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিশেষ পথ্য, প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক খাদ্য এবং নিউট্রাসিউটিক্যালসহ সংশ্লিষ্ট পণ্য। শিশুদের ফর্মুলা দুধ এবং নির্দিষ্ট রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য তৈরি বিশেষ খাদ্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বিধান অনুসরণ করতে হবে। অর্থাৎ, সব খাদ্য ব্যবসার জন্য একই ধরনের অনুমোদন প্রয়োজন হবে না। ব্যবসার ধরন ও পণ্যের শ্রেণি অনুযায়ী নিবন্ধন অথবা লাইসেন্স নিতে হবে।
প্রথম নিবন্ধন বিনামূল্যে
নতুন প্রবিধানমালার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রচলিত ১৬ শ্রেণির খাদ্য ব্যবসার প্রথমবার নিবন্ধন বিনামূল্যে করার বিধান রাখা হয়েছে। তবে, বিশেষায়িত খাদ্যপণ্যের লাইসেন্সের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফি দিতে হবে।
প্রবিধানমালায় প্রিমিসেস লাইসেন্সের ফি প্রতিষ্ঠানের আয়তনের ভিত্তিতে নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১০০ বর্গমিটার বা তার কম আয়তনের প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন লাইসেন্সের ফি ১০ হাজার টাকা। ১০ হাজার বর্গমিটারের বেশি আয়তনের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই ফি ৬০ হাজার টাকা।
নিবন্ধনের জন্য নির্ধারিত ফরম ৫.১ এবং লাইসেন্সের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ফরম ৬.১, ৭.১, ৮.১ ও ৯.১ অনুযায়ী আবেদন করতে হবে। ফি, শর্ত ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের বিষয়ে প্রবিধানমালার সংশ্লিষ্ট বিধান অনুসরণ করতে হবে।
প্রাথমিকভাবে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট জেলা কার্যালয়ে আবেদন করার সুযোগ থাকবে। পর্যায়ক্রমে আবেদন প্রক্রিয়া পুরোপুরি অনলাইনে নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে কর্তৃপক্ষের।
প্রতিটি খাদ্যপণ্যের মোড়কে বিএফএসএর নিবন্ধন নম্বর উল্লেখ করার বিধানও রাখা হয়েছে। এর ফলে ভোক্তারা পণ্যের নিবন্ধন-সংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ পাবেন। কোনো অভিযোগ জানাতেও এই নম্বর কাজে লাগতে পারে।
আগে প্রচারণা, পরে অভিযান
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মনিটরিং অফিসার ইমরান হোসেন মোল্লা রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, নতুন প্রবিধানমালা বাস্তবায়নের আগে ব্যবসায়ীদের আইন সম্পর্কে জানানোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এজন্য প্রচারণা চালানো, লিফলেট বিতরণ এবং গণমাধ্যমে তথ্য প্রচারের পরিকল্পনা রয়েছে। ব্যবসায়ীরা যেন নিবন্ধনের নিয়ম, আবেদনপ্রক্রিয়া ও বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে জানতে পারেন, সেজন্য প্রথম পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হবে।
তিনি আরও বলেন, সচেতনতা কার্যক্রমের পর ব্যবসায়ীদের প্রস্তুতির জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় দেওয়া হবে। এর পর নিয়ম বাস্তবায়নে অভিযান পরিচালনা করা হবে। অর্থাৎ শুরুতেই অভিযান নয়; আগে আইনটি সম্পর্কে জানানো এবং পরে তা পরিপালনে ব্যবসায়ীদের বাধ্য করার পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (আইন ও নীতি) মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, “খাদ্য ব্যবসার নিবন্ধন ব্যবস্থা সম্প্রসারণের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো— ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি তালিকার আওতায় আনা। বিশেষ করে, ফুটপাতের খাবারের দোকানসহ ছোট পরিসরের যেসব ব্যবসা এতদিন তদারকির আওতায় যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল না, সেগুলোর তথ্য সংরক্ষণে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”
তিনি বলেন, “নিবন্ধনের মাধ্যমে কোন এলাকায় কী ধরনের খাদ্য ব্যবসা রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ও অবস্থান সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য থাকবে। এতে খাদ্য নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অভিযোগের অনুসন্ধান, তদারকি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হতে পারে। তবে নতুন নিয়ম কার্যকর করতে ব্যবসায়ীদের বিষয়টি বোঝানো এবং তাদের নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা জরুরি।”
আইন সম্পর্কে জানেন না বিক্রেতারা
লালবাগের খাবার বিক্রেতা সোহেল জানান, তিনি প্রতিদিন দোকানে খাবার বিক্রি করেন। কিন্তু, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিবন্ধন নিতে হবে, এমন কোনো তথ্য তার জানা নেই। নিবন্ধনের নিয়ম, কোথায় আবেদন করতে হবে কিংবা কী কী কাগজপত্র লাগবে, সে বিষয়েও তিনি কিছু জানেন না।
আজিমপুরের বিক্রেতা রাইসুলও নতুন বিধান সম্পর্কে অবগত নন। তার মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছে সরকারি নতুন নিয়মের তথ্য কীভাবে পৌঁছাবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। কারণ, দোকানের কাজ সামলে সরকারি দপ্তরে যাওয়া কিংবা আবেদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানার সুযোগ তাদের সীমিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বিক্রেতা আনোয়ার বলেন, খাবারের দোকানের জন্য নিবন্ধন নিতে হবে, এ বিষয়ে তিনি আগে কিছু শোনেননি। নতুন নিয়ম হলে তা আগে তাদেরকে জানানো প্রয়োজন।
তার বক্তব্য, এ ধরনের আইন করতে গিয়ে যেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অযথা ভোগান্তিতে পড়তে না হয়। নিবন্ধন করতে গিয়ে অতিরিক্ত ঝামেলা, সময়ক্ষেপণ বা অপ্রয়োজনীয় খরচের মুখে পড়লে তাদের জন্য ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এই তিন বিক্রেতার বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, নতুন প্রবিধানমালার আওতায় যাদের আনার কথা বলা হচ্ছে, তাদের অন্তত একটি অংশের কাছে এখনো নিয়মটির তথ্য পৌঁছায়নি। তবে, রাজধানীর সব ফুটপাতের বিক্রেতার পরিস্থিতি একই—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও বিস্তৃত মাঠপর্যায়ের তথ্য প্রয়োজন।
বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ কোথায়
নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে খাদ্য ব্যবসার তথ্যভাণ্ডার তৈরি এবং তদারকি জোরদারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু, ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের প্রশ্নটি শুধু আইন জানানোয় সীমাবদ্ধ নয়। তাদের নিবন্ধনের প্রক্রিয়া কতটা সহজ হবে, কী ধরনের পরিচয়পত্র বা নথি প্রয়োজন হবে, অস্থায়ী দোকান কিংবা ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদের ঠিকানা কীভাবে নথিভুক্ত করা হবে এবং নিবন্ধনের পর নিয়মিত তদারকি কীভাবে হবে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমবার নিবন্ধন বিনামূল্যে হলেও আবেদন করতে সময়, যাতায়াত ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহের খরচ থাকতে পারে। অনলাইন আবেদন পুরোপুরি চালু হলে প্রযুক্তি ব্যবহারে অভ্যস্ত নন, এমন বিক্রেতাদের জন্য সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে। আবার নিবন্ধন নম্বর ব্যবহারের বিধান কার্যকর করতে হলে প্যাকেটজাত পণ্যের পাশাপাশি কোন ধরনের খুচরা বা তাৎক্ষণিকভাবে প্রস্তুত খাবারের ক্ষেত্রে কীভাবে এই শর্ত প্রযোজ্য হবে, তা স্পষ্ট করা জরুরি।
নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ এবং নতুন প্রবিধানমালা অনুযায়ী, যেসব ব্যবসার নিবন্ধন বা লাইসেন্স বাধ্যতামূলক, সেগুলো অনুমোদন ছাড়া পরিচালনা করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাই, সচেতনতা ও নিবন্ধনের সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইন প্রয়োগের পদ্ধতি স্বচ্ছ হওয়াও জরুরি।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান শনাক্ত করা এবং তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। তবে, উদ্যোগটির কার্যকারিতা নির্ভর করবে নিবন্ধন কতটা সহজে করা যায়, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কতটা সহযোগিতা পান এবং নিবন্ধনের পর কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে খাদ্যের মান ও স্বাস্থ্যবিধি তদারক করতে পারে কি না, তার ওপর।
সারাদেশ | ২২ অক্টোবর ২০২৬
ফুটপাতের খাবারের দোকানও আসছে নিবন্ধনের আওতায়
























