শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬, ১৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তারেক রহমান-শি জিন পিং ঐতিহাসিক বৈঠক ২৬ জুন

নিজস্ব প্রতিবেদক:
  • প্রকাশিত : শনিবার, ২০ জুন ২০২৬। ৪:৪৭:১১ এএম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধ্বস বিজয় অর্জনের মাধ্যমে তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। গত ১৭ ফ্রেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর এই প্রথম বিদেশ সফরে যাচ্ছেন তিনি। প্রথম সফরেই মালয়েশিয়া এবং চীনকে বেছে নিয়েছেন তারেক রহমান। আগামীকাল ২১ জুন তার মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করার কথা রয়েছে। সেখানে দুই দিন অবস্থান করে ২২ জুন রাতেই মালয়েশিয়া থেকেই সরাসরি চলে যাবেন চীনে। চীনে বেশ কয়েকটি সম্মেলনে অংশ নেয়ার পাশাপাশি চীন সরকার ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন তারেক রহমান। সফরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এর সঙ্গে বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক। এটি “আগামী ২৬ জুন” হতে পারে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

সরকার ও বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম এই বিদেশ সফরটি (মালয়েশিয়া ও চীন) বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি উভয় ক্ষেত্রেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, একজন নতুন রাষ্ট্রপ্রধানের প্রথম সফরের গন্তব্য নির্বাচনই আন্তর্জাতিক মহলে তার সরকারের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় বার্তা দেয়। বিশেষ করে, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ভারত ও চীনের মধ্যকার কৌশলগত দ্বন্দ্বে বাংলাদেশ সবসময় একটি সংবেদনশীল অবস্থানে থাকে। সাধারণত বাংলাদেশের সরকারপ্রধানদের প্রথম সফর নয়াদিল্লি বা বেইজিং দিয়ে শুরু হওয়ার একটি প্রথাগত রেওয়াজ রয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়ে এবং তার পরপরই চীন সফরে গিয়ে একটি অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক চাল চেলেছেন। এর মাধ্যমে তিনি সরাসরি কোনো আঞ্চলিক পরাশক্তির পক্ষ না নিয়ে একটি স্বতন্ত্র ও ‘স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি’র বার্তা দিলেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফরে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও সবুজ অবকাঠামো সংক্রান্ত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নেবেন। বেইজিংয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বড় বিনিয়োগ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিয়ে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের আহ্বান জানাবেন। ইনভেস্টমেন্ট সামিটের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী চীনের বেশ কিছু বিশ্বখ্যাত বহুজাতিক কোম্পানি, যেমন- চেরি, হান্ডা এবং টেক্সটাইল জায়ান্ট চায়নাটেক্স এর শীর্ষ প্রতিনিধিদের সাথে বিশেষ বৈঠক করবেন।

আর দ্বিপাক্ষিক মূল বৈঠকগুলো অনুষ্ঠিত হবে বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ। ‘আগামী ২৫ জুন’ তিনি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এবং চীনের প্রিমিয়ার (প্রধানমন্ত্রী) লি কিয়াং এর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন। সফরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠক। এটি সফরের শেষভাগে ‘আগামী ২৬ জুন’ অনুষ্ঠিত হবে। তবে বৈঠকের তারিখ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোন পক্ষই নিশ্চিত ও প্রকাশ করেনি।

এর মধ্যে বাংলাদেশে প্রস্তাবিত চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের ডেভেলপার বা উন্নয়নকারী হিসেবে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ কর্পোরেশনকে (সিআরবিসি) নিয়োগ দিয়ে সরকারের একটি চুক্তি স্বাক্ষরের কথা রয়েছে। এই চুক্তিটি একটি পরিকল্পিত মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলটিতে (ফ্রি ট্রেড জোন) চীনা বিনিয়োগকেও উৎসাহিত করবে। এর পাশাপাশি কেরানীগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের জন্য চীনের হান্ডা গ্রুপকে জমি বরাদ্দের চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) প্রস্তাব অনুযায়ী, ভূমি উন্নয়নের পর চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে বাংলাদেশের ৩০ শতাংশ অংশীদারিত্ব বা স্টেক থাকবে, আর বাকি ৭০ শতাংশ অংশীদারিত্ব থাকবে চীনের কাছে।

অংশীদারিত্বের (ইক্যুইটি) এই সুনির্দিষ্ট বিভাজনটি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) একটি সুপরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের প্রতিফলন। একটি তুলনামূলক প্রতিবেদনে ইআরডি উল্লেখ করেছে যে, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চলের মালিকানা বন্টনে জাপানকে ৭৬ শতাংশ ও বাংলাদেশকে ২৪ শতাংশ ইক্যুইটি দেওয়া হয়েছে, যাতে দেশের কৌশলগত আর্থিক স্বার্থহানী হয়েছে।

সফরকালে চীন সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (জিডিআই), ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম (সিআইপিএস) এবং গ্রিন মাইনিং অ্যান্ড মিনারেলস সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সহযোগিতা উদ্যোগসহ বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক আর্থিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের প্রস্তাব দিতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ চীনা মুদ্রায় ‘পান্ডা বন্ড’ চালুর একটি প্রস্তাবও পর্যালোচনা করছে বাংলাদেশ।

তথ্যমতে, চীন দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা শুরু করা, কারেন্সি সোয়াপ (মুদ্রা অদল-বদল) চুক্তি স্বাক্ষর, বাংলাদেশ-চীন বিনিয়োগ চুক্তি আধুনিকায়ন বা আপগ্রেড করা এবং বাংলাদেশে একটি চীনা ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও দিয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চীন বৈশ্বিক নেতা এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে উচ্চমানের বৈদ্যুতিক যান (ইভি) উৎপাদনের জন্য আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃতি অর্জন করেছে। বাংলাদেশ যেহেতু তার জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে চায়, তাই সরকার বৈদ্যুতিক যান উৎপাদনের ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে উল্লেখযোগ্য দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে। এই দুটি খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে, আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাপকভাবে কর ছাড়ের সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, “প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হলে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বৈদ্যুতিক যান খাতে চীনা বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর ঘটবে। দুই দেশ যৌথভাবে সবুজ জ্বালানি এবং বৈদ্যুতিক যানের ওপর গবেষণাও করবে।”
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে নীলফামারীতে ১,০০০ শয্যাবিশিষ্ট ‘বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী হাসপাতাল’ প্রতিষ্ঠার জন্য একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে। চীন এই প্রকল্পে অনুদান বা গ্র্যান্টের মাধ্যমে অর্থায়ন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া ‘মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন’ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য চীনের সঙ্গে একটি চুক্তি সই করতে পারে বাংলাদেশ। জানা গেছে, আগের আওয়ামী সরকারের সময় এই প্রকল্পের জন্য চীনা অর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ভারতের আপত্তির কারণে তা আরো এগোয়নি বলে জানা গেছে।

সরকার তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প, প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প, দ্বিতীয় পদ্মা সেতু এবং দ্বিতীয় যমুনা সেতুসহ বেশ কয়েকটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পের জন্যও চীনের অর্থায়ন চাইবে বলে আশা করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ইতোমধ্যেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলোর একটি তালিকা সংগ্রহ করেছে, যেগুলোতে চীনের অর্থায়নের সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরে চীনা বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন এবং অবকাঠামো খাতে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। তিনি বলেন, বিনিয়োগ ছাড়াও সামরিক এবং রাজনৈতিক বিষয়ও সেখানে আলোচনায় উঠতে পারে।

আশিক চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কয়েকটি বড় চীনা কোম্পানির বৈঠকেরও আয়োজন করা হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে এবং তাদের সামনে বাংলাদেশের নতুন বিনিয়োগের সুযোগগুলো তুলে ধরা হবে।
বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, চীন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত অংশীদার। প্রধানমন্ত্রীর সফরে শুধু বিনিয়োগ নয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, অবকাঠামো ও অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় বিষয়ও আলোচনায় আসবে।

জাতীয় | ২০ জুন ২০২৬

তারেক রহমান-শি জিন পিং ঐতিহাসিক বৈঠক ২৬ জুন

বিস্তারিত | dainikamarnews.com
বিষয় :

তারেক রহমান-শি জিন পিং ঐতিহাসিক বৈঠক ২৬ জুন

Update Time : ০৪:৪৭:১১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধ্বস বিজয় অর্জনের মাধ্যমে তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। গত ১৭ ফ্রেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর এই প্রথম বিদেশ সফরে যাচ্ছেন তিনি। প্রথম সফরেই মালয়েশিয়া এবং চীনকে বেছে নিয়েছেন তারেক রহমান। আগামীকাল ২১ জুন তার মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করার কথা রয়েছে। সেখানে দুই দিন অবস্থান করে ২২ জুন রাতেই মালয়েশিয়া থেকেই সরাসরি চলে যাবেন চীনে। চীনে বেশ কয়েকটি সম্মেলনে অংশ নেয়ার পাশাপাশি চীন সরকার ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন তারেক রহমান। সফরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এর সঙ্গে বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক। এটি “আগামী ২৬ জুন” হতে পারে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

সরকার ও বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম এই বিদেশ সফরটি (মালয়েশিয়া ও চীন) বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি উভয় ক্ষেত্রেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, একজন নতুন রাষ্ট্রপ্রধানের প্রথম সফরের গন্তব্য নির্বাচনই আন্তর্জাতিক মহলে তার সরকারের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় বার্তা দেয়। বিশেষ করে, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ভারত ও চীনের মধ্যকার কৌশলগত দ্বন্দ্বে বাংলাদেশ সবসময় একটি সংবেদনশীল অবস্থানে থাকে। সাধারণত বাংলাদেশের সরকারপ্রধানদের প্রথম সফর নয়াদিল্লি বা বেইজিং দিয়ে শুরু হওয়ার একটি প্রথাগত রেওয়াজ রয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়ে এবং তার পরপরই চীন সফরে গিয়ে একটি অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক চাল চেলেছেন। এর মাধ্যমে তিনি সরাসরি কোনো আঞ্চলিক পরাশক্তির পক্ষ না নিয়ে একটি স্বতন্ত্র ও ‘স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি’র বার্তা দিলেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফরে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও সবুজ অবকাঠামো সংক্রান্ত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নেবেন। বেইজিংয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বড় বিনিয়োগ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিয়ে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের আহ্বান জানাবেন। ইনভেস্টমেন্ট সামিটের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী চীনের বেশ কিছু বিশ্বখ্যাত বহুজাতিক কোম্পানি, যেমন- চেরি, হান্ডা এবং টেক্সটাইল জায়ান্ট চায়নাটেক্স এর শীর্ষ প্রতিনিধিদের সাথে বিশেষ বৈঠক করবেন।

আর দ্বিপাক্ষিক মূল বৈঠকগুলো অনুষ্ঠিত হবে বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ। ‘আগামী ২৫ জুন’ তিনি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এবং চীনের প্রিমিয়ার (প্রধানমন্ত্রী) লি কিয়াং এর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন। সফরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠক। এটি সফরের শেষভাগে ‘আগামী ২৬ জুন’ অনুষ্ঠিত হবে। তবে বৈঠকের তারিখ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোন পক্ষই নিশ্চিত ও প্রকাশ করেনি।

এর মধ্যে বাংলাদেশে প্রস্তাবিত চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের ডেভেলপার বা উন্নয়নকারী হিসেবে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ কর্পোরেশনকে (সিআরবিসি) নিয়োগ দিয়ে সরকারের একটি চুক্তি স্বাক্ষরের কথা রয়েছে। এই চুক্তিটি একটি পরিকল্পিত মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলটিতে (ফ্রি ট্রেড জোন) চীনা বিনিয়োগকেও উৎসাহিত করবে। এর পাশাপাশি কেরানীগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের জন্য চীনের হান্ডা গ্রুপকে জমি বরাদ্দের চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) প্রস্তাব অনুযায়ী, ভূমি উন্নয়নের পর চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে বাংলাদেশের ৩০ শতাংশ অংশীদারিত্ব বা স্টেক থাকবে, আর বাকি ৭০ শতাংশ অংশীদারিত্ব থাকবে চীনের কাছে।

অংশীদারিত্বের (ইক্যুইটি) এই সুনির্দিষ্ট বিভাজনটি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) একটি সুপরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের প্রতিফলন। একটি তুলনামূলক প্রতিবেদনে ইআরডি উল্লেখ করেছে যে, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চলের মালিকানা বন্টনে জাপানকে ৭৬ শতাংশ ও বাংলাদেশকে ২৪ শতাংশ ইক্যুইটি দেওয়া হয়েছে, যাতে দেশের কৌশলগত আর্থিক স্বার্থহানী হয়েছে।

সফরকালে চীন সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (জিডিআই), ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম (সিআইপিএস) এবং গ্রিন মাইনিং অ্যান্ড মিনারেলস সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সহযোগিতা উদ্যোগসহ বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক আর্থিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের প্রস্তাব দিতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ চীনা মুদ্রায় ‘পান্ডা বন্ড’ চালুর একটি প্রস্তাবও পর্যালোচনা করছে বাংলাদেশ।

তথ্যমতে, চীন দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা শুরু করা, কারেন্সি সোয়াপ (মুদ্রা অদল-বদল) চুক্তি স্বাক্ষর, বাংলাদেশ-চীন বিনিয়োগ চুক্তি আধুনিকায়ন বা আপগ্রেড করা এবং বাংলাদেশে একটি চীনা ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও দিয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চীন বৈশ্বিক নেতা এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে উচ্চমানের বৈদ্যুতিক যান (ইভি) উৎপাদনের জন্য আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃতি অর্জন করেছে। বাংলাদেশ যেহেতু তার জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে চায়, তাই সরকার বৈদ্যুতিক যান উৎপাদনের ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে উল্লেখযোগ্য দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে। এই দুটি খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে, আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাপকভাবে কর ছাড়ের সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, “প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হলে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বৈদ্যুতিক যান খাতে চীনা বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর ঘটবে। দুই দেশ যৌথভাবে সবুজ জ্বালানি এবং বৈদ্যুতিক যানের ওপর গবেষণাও করবে।”
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে নীলফামারীতে ১,০০০ শয্যাবিশিষ্ট ‘বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী হাসপাতাল’ প্রতিষ্ঠার জন্য একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে। চীন এই প্রকল্পে অনুদান বা গ্র্যান্টের মাধ্যমে অর্থায়ন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া ‘মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন’ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য চীনের সঙ্গে একটি চুক্তি সই করতে পারে বাংলাদেশ। জানা গেছে, আগের আওয়ামী সরকারের সময় এই প্রকল্পের জন্য চীনা অর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ভারতের আপত্তির কারণে তা আরো এগোয়নি বলে জানা গেছে।

সরকার তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প, প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প, দ্বিতীয় পদ্মা সেতু এবং দ্বিতীয় যমুনা সেতুসহ বেশ কয়েকটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পের জন্যও চীনের অর্থায়ন চাইবে বলে আশা করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ইতোমধ্যেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলোর একটি তালিকা সংগ্রহ করেছে, যেগুলোতে চীনের অর্থায়নের সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরে চীনা বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন এবং অবকাঠামো খাতে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। তিনি বলেন, বিনিয়োগ ছাড়াও সামরিক এবং রাজনৈতিক বিষয়ও সেখানে আলোচনায় উঠতে পারে।

আশিক চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কয়েকটি বড় চীনা কোম্পানির বৈঠকেরও আয়োজন করা হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে এবং তাদের সামনে বাংলাদেশের নতুন বিনিয়োগের সুযোগগুলো তুলে ধরা হবে।
বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, চীন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত অংশীদার। প্রধানমন্ত্রীর সফরে শুধু বিনিয়োগ নয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, অবকাঠামো ও অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় বিষয়ও আলোচনায় আসবে।

জাতীয় | ২০ জুন ২০২৬

তারেক রহমান-শি জিন পিং ঐতিহাসিক বৈঠক ২৬ জুন

বিস্তারিত | dainikamarnews.com