ভিউয়ের নেশায় যাচাই-বাছাই ছাড়া ফেসবুক-ইউটিউবে প্রচার ,জনমনে বিভ্রান্তি
- প্রকাশিত : রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬। ৪:৩৬:০২ এএম
মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ, এরপর যাচাই-বাছাই ছাড়াই ফেসবুক-ইউটিউবে প্রচার। কখনো ধর্ষণের শিকার নারীর পরিচয় প্রকাশ, কখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ব্যক্তিকে মৃত ঘোষণা, আবার কখনো মৃত্যুর ঘটনাকে নিশ্চিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে উপস্থাপন। এসব কনটেন্ট ঘিরে ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি, তৈরি হচ্ছে উত্তেজনা। বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবার, পুলিশ ও মূলধারার সাংবাদিকদের।
মানিকগঞ্জের সিংগাইরে সাম্প্রতিক তিনটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন উঠেছে, ভিউ বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় হারিয়ে যাচ্ছে কি সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা?
সিংগাইরে ২৩ বছর বয়সী এক নারীকে গণধর্ষণের অভিযোগে করা মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে সকলেই আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন।
অভিযোগ ওঠেছে, কতিপয় ইউটিউবার ও কনটেন্ট নির্মাতা ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ করে ভিডিও প্রচার করেছেন। তাঁর আত্মীয়স্বজন ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের সাক্ষাৎকারও পরিচয় প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে পরিবারটি সামাজিক ও পারিবারিক সংকটে পড়েছে। সাক্ষাৎকার দেওয়া ব্যক্তিরাও হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
অন্যদিকে, সিংগাইরের ধল্লা ইউনিয়নে শহিদুল ইসলাম (২২) নামের এক যুবককে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা হয়েছে। এজাহার অনুযায়ী, গত ৬ সেপ্টেম্বর রাতে পূর্ববিরোধের জেরে তাঁর ওপর দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালানো হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। অভিযোগ রয়েছে, চিকিৎসাধীন অবস্থায় কয়েকজন কনটেন্ট নির্মাতা তাঁকে মৃত ঘোষণা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর প্রচার করেন। এরপর তাঁর স্বজনেরা অভিযুক্তদের বাড়িঘরে হামলা ও ভাঙচুরে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাল্টা মামলাও হয়েছে বলে জানা গেছে।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনা সিংগাইরের সাহরাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মারিয়া মাহির (১৪) মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা দাবি ছড়িয়েছে। গত ১৫ জুন বিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় সে। ছয় দিন পর ২১ জুন চন্দননগর এলাকার একটি কবরস্থানসংলগ্ন ঝোপে গাছের ডালে ঝুলন্ত অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন তার মা হত্যা মামলা করেন। এ মামলায় শিক্ষক, সংবাদকর্মী ও শিক্ষার্থীসহ মোট নয়জন গ্রেপ্তার হন বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন কনটেন্টে মারিয়ার মৃত্যুকে নিশ্চিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে প্রচার করার পাশাপাশি মরদেহে অ্যাসিড নিক্ষেপ ও গোপনাঙ্গে রড ঢোকানোর মতো জঘন্যতম গুরুতর দাবিও ছড়ানো হয়েছিল। এসব দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। অন্যদিকে, ময়নাতদন্তের ফল নিয়ে আত্মহত্যার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। ওসি মো. মাজহারুল ইসলামও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে আত্মহত্যার কথা উঠে এসেছে বলে জানিয়েছেন। তবে মারিয়ার পরিবার শুরু থেকেই হত্যার অভিযোগ করে আসছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে তদন্তের তথ্য ও চিকিৎসা-আইনগত প্রতিবেদন যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি। মামলার আসামিরা জামিনে মুক্তি পেয়েছেন এবং তাঁরা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এব্যাপারে সিংগাইর প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. সোহরাব হোসেন বলেন, মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে পোস্ট করলেই কেউ সাংবাদিক হয়ে যান না। সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা জরুরি। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু কনটেন্ট নির্মাতা রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছে প্রাধান্য পাচ্ছেন। অথচ তাঁদের প্রকাশিত যাচাইহীন ভিডিও ও পোস্টের কারণে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে, যা মূলধারার সাংবাদিকদেরও বিব্রত করছে।
তাঁর মতে, ভিউ বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় যাচাইহীন তথ্য প্রচার, ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ এবং একপক্ষের বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণে স্থানীয় পর্যায়ে উত্তেজনা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। তাই সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য নেওয়া জরুরি।
এ ব্যাপারে সিংগাইর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, “এরা অপসাংবাদিকতা করে থাকে। ভিউ বাড়ানোর জন্য এমন জঘন্য কাজ করেছে। এরা মোটেও সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা জানেন না।” বিশেষ করে সাহরাইল স্কুলের শিক্ষার্থী মারিয়া মাহির মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে প্রচারিত বিভিন্ন তথ্য নিয়ে পুলিশ বিব্রত হয়েছে বলে জানান তিনি। সিংগাইরের তিনটি ঘটনা নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতির বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে বলেও জানান ওসি।
অপরাধ | ১১ অক্টোবর ২০২৬
ভিউয়ের নেশায় যাচাই-বাছাই ছাড়া ফেসবুক-ইউটিউবে প্রচার ,জনমনে বিভ্রান্তি




















