লেখাপড়া না জেনেও শুনে শুনে কুরআন মুখস্থ, ৭১-এ এক বৈঠকে কুরআন খতম
- প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ৫:০৮:২৪ এএম
লেখাপড়া শেখার সুযোগ হয়নি। কুরআনের আয়াত পড়েছেন মূলত শুনে শুনে। রেডিওতে কুরআন তিলাওয়াত শোনা, নিয়মিত অনুশীলন এবং হিফজের আসরে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে জীবনের দীর্ঘ সময় ধরে পবিত্র কুরআনকে হৃদয়ে ধারণ করেছেন মিশরের ৭১ বছর বয়সি সুকরা সেলিম। একই বয়সি তার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী থানা জিদানও পারিবারিক দায়িত্ব সামলে সম্পূর্ণ কুরআন হিফজ করেছেন। মিশরের মেনুফিয়া প্রদেশের মিত শেহালা গ্রামের এই দুই নারীর কুরআনের সঙ্গে দীর্ঘ সাধনার ঘটনা দেশটির সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে।
সুকরা সেলিমের হিফজের যাত্রা শুরু হয় ৫০ বছর বয়সে। বয়সের এই পর্যায়ে এসে তিনি প্রতিদিন মাত্র দুই আয়াত করে মুখস্থ করতেন। এরপর সারা দিন সেই আয়াতগুলো বারবার শুনে ও মনে মনে আওড়াতেন। পড়তে-লিখতে না জানায় তার জন্য রেডিওর কুরআন তিলাওয়াতই হয়ে ওঠে শেখার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। পাশাপাশি হিফজের আসরে অংশ নিয়ে শুনে শুনে আয়াত মুখস্থ করতেন তিনি।
স্বামী মারা যাওয়ার সময় সুকরার ১৬ পারা কুরআন মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। স্বামীর মৃত্যুর পরও থেমে থাকেননি তিনি। নিয়মিত অনুশীলন চালিয়ে যেতে যেতে একপর্যায়ে পুরো ৩০ পারা কুরআন মুখস্থ করে ফেলেন। বয়স বাড়লেও কুরআন চর্চার ক্ষেত্রে তার আগ্রহ ও অধ্যবসায় কমেনি।
অন্যদিকে ছোটবেলা থেকেই কুরআন হিফজের আকাঙ্ক্ষা ছিল থানা জিদানের। তবে সংসার, সন্তান প্রতিপালন ও পারিবারিক নানা দায়িত্বের কারণে দীর্ঘ সময় সেই ইচ্ছা পূরণে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ হয়নি। সন্তানদের বড় করার পর তিনি নতুন করে হিফজে মনোনিবেশ করেন এবং ৬৫ বছর বয়সে সম্পূর্ণ কুরআন মুখস্থ করেন।
হিফজ সম্পন্ন করার পরও কুরআনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক থেমে যায়নি। সুকরা ও থানা এখন নিয়মিত একসঙ্গে বসে মুখস্থ কুরআন পুনরাবৃত্তি করেন। জানা গেছে, তারা প্রতিদিন পাঁচ পারা করে একসঙ্গে মুরাজাআ করেন। এভাবে সপ্তাহে একবার পুরো কুরআন পুনরাবৃত্তি করার চর্চাও রয়েছে তাদের।
এই দুই নারীর অধ্যবসায়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে গত ৩০ আগস্ট। ‘বিশ্ব কুরআন বর্ণনা দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচিতে অংশ নেন তারা। ফজরের নামাজের পর থানা জিদান মুখস্থ থেকে কুরআন তিলাওয়াত শুরু করেন। প্রায় ১৩ ঘণ্টা ধরে একটানা তিলাওয়াত করে তিনি এক বৈঠকেই পুরো কুরআন শেষ করেন। মিশরের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ ঘটনাকে তাদের দীর্ঘদিনের হিফজ ও নিয়মিত মুরাজাআর ফল হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
একই অনুষ্ঠানে সুকরা সেলিমও অংশ নেন এবং মুখস্থ থেকে কুরআন তিলাওয়াত করেন। আল-আজহারের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে এবার ‘পড়ো ও উন্নত হও’ প্রতিপাদ্য সামনে রাখা হয়। মিশরের বিভিন্ন অঞ্চলে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়, যেখানে হাফেজদের মুখস্থ থেকে কুরআন তিলাওয়াতের সুযোগ দেওয়া হয়।
তাদের এই অসাধারণ কুরআন হিফজ ও তিলাওয়াতের স্বীকৃতি হিসেবে মেনুফিয়া প্রদেশের ধর্মবিষয়ক কর্তৃপক্ষ পরে দুজনকে সম্মাননা দেয়। ৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে মেনুফিয়ার আওকাফ বিভাগের পক্ষ থেকে সুকরা ও থানাকে সম্মাননা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। কর্তৃপক্ষ জানায়, কুরআনের ধারক-বাহকদের সম্মান জানানো এবং কুরআনচর্চায় উৎসাহ দেওয়ার অংশ হিসেবেই এ সম্মাননা দেওয়া হয়েছে।
এর আগে তাদের কুরআন তিলাওয়াতের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর সৌদি আরবপ্রবাসী মিশরীয় ব্যবসায়ী প্রকৌশলী মোহাম্মদ হাইসাম সুলতান দুজনকে ওমরাহ পালনের জন্য দুটি সফর উপহার দেওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি জানান, তাদের কুরআন হিফজ ও এক বৈঠকে সম্পূর্ণ কুরআন তিলাওয়াতের ঘটনা জানতে পেরে তিনি এ উদ্যোগ নেন। তার পরিবারের সদস্য ও কয়েকজন সহযোগীও এ উদ্যোগে অংশ নেন।
ওমরাহর উপহার পেয়ে সুকরা সেলিম জানান, পবিত্র কাবা শরিফ জিয়ারত ও ওমরাহ পালনের ইচ্ছা তার দীর্ঘদিনের। অন্যদিকে থানা জিদানও এ উপহারে আনন্দ প্রকাশ করেন এবং আল্লাহর কাছে করা দীর্ঘদিনের দোয়া পূরণ হওয়ার কথা জানান। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করে ওমরাহ পালনে পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
লেখাপড়া শেখার সুযোগ না পেয়েও কেবল শুনে শুনে কুরআন মুখস্থ করা সুকরা সেলিম এবং জীবনের নানা দায়িত্ব শেষ করে ৬৫ বছর বয়সে হিফজ সম্পন্ন করা থানা জিদানের গল্প মিশরে নতুন করে কুরআনচর্চা ও অধ্যবসায়ের দৃষ্টান্ত হিসেবে আলোচনায় এসেছে। ৭১ বছর বয়সেও তাদের নিয়মিত মুরাজাআ এবং এক বৈঠকে সম্পূর্ণ কুরআন তিলাওয়াতের সক্ষমতা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
ধর্ম | ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
লেখাপড়া না জেনেও শুনে শুনে কুরআন মুখস্থ, ৭১-এ এক বৈঠকে কুরআন খতম



















