মানিকগঞ্জে স্বাস্থ্যসেবার করুণ দশা: রোগী একটু মুমূর্ষু হলেই রেফার্ড করছে ঢাকায়
- প্রকাশিত : বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬। ১:৪৯:০৪ পিএম
মানিকগঞ্জে স্বাস্থ্যসেবার চিত্র দিন দিন যেন আরও হতাশাজনক হয়ে উঠছে। জেলা শহরে একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালসহ সরকারি স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই অবকাঠামো কি জেলার মানুষের কাংক্ষিত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে পারছে?
বাস্তবতা বলছে, জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে গুরুতর অসুস্থ রোগী নিয়ে স্বজনরা প্রথমে ছুটে আসেন জেলা সদর হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসা পাওয়ার প্রত্যাশা থাকে। চিকিৎসক ও নার্সরা আন্তরিকভাবে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করলেও জনবল, চিকিৎসা সরঞ্জাম, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং অন্যান্য সংকটের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই কাংক্ষিত সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। রোগীর অবস্থা কিছুটা জটিল হলেই তাকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। আর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে অনেক রোগীকে শেষ পর্যন্ত ঢাকামুখী হতে হয়।
এভাবে জেলা হাসপাতাল থেকে মেডিকেল কলেজ, আর সেখান থেকে ঢাকার হাসপাতালে রোগীর সঙ্গে যেন চলছে এক ধরনের ‘রেফার্ডের যাত্রা’। এর ফলে শুধু রোগীর চিকিৎসা বিলম্বিত হচ্ছে না, বাড়ছে স্বজনদের ভোগান্তি, যাতায়াত ব্যয় এবং চিকিৎসার অতিরিক্ত খরচ।
২০১৫ সালে মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল জেলার মানুষের আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত করা। অথচ অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। কিছু মেশিন ও যন্ত্রপাতি থাকলেও সেগুলোর সবসময় কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না এমন অভিযোগও রয়েছে। ফলে অনেক রোগীকে বাইরে থেকে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে।
একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মাত্র প্রতিদিন ৮/১০ আলট্রাসনোগ্রাম হয়। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রে রোগীদের দীর্ঘ অপেক্ষা কিংবা বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যদি রোগীকে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোর জন্য বারবার বাইরে যেতে হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে সরকারি স্বাস্থ্য অবকাঠামোর সুফল মানুষ কতটা পাচ্ছেন? এছাড়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আইসিইউ সেবা চালুর কথা বলেও প্রকৃত অর্থে চিকিৎসক, নার্স ও অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান না থাকায় আইসিইউ সেবার কোন কার্যকারিতা নেই। এর জন্য অনেক রোগীকে জীবন দিতে হচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনবল সংকট। চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ডবয় ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পর্যাপ্ততা নিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ। হাসপাতালের মতো একটি প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক দক্ষ জনবল না থাকলে আধুনিক অবকাঠামো থাকলেও কাংক্ষিত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা কঠিন।
চিকিৎসকদের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিয়েও মানুষের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, নির্ধারিত সময়ের আগেই কিছু চিকিৎসক কর্মস্থল ত্যাগ করেন কিংবা বাইরে ব্যক্তিগত চিকিৎসা কার্যক্রমে যুক্ত থাকেন। এসব অভিযোগ সত্য হলে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তবে অভিযোগের পাশাপাশি বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করে প্রশাসনিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।
অন্যদিকে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট মানিকগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালও নানা সংকটে রয়েছে। রোগীর তুলনায় জনবল কম, ওয়ার্ডবয় ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ঘাটতি, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতা সব মিলিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেও প্রতিনিয়ত সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। আউটসোর্সিংয়ের কর্মীদের দিয়ে কোনোভাবে সেবা চালিয়ে নেওয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি টেকসই সমাধান হতে পারে না।
স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। একজন দরিদ্র কৃষক, শ্রমিক কিংবা নিম্নআয়ের মানুষ যখন অসুস্থ হয়ে সরকারি হাসপাতালে আসেন, তখন তার প্রথম প্রত্যাশা থাকে নিজ জেলার হাসপাতালেই যেন চিকিৎসা পাওয়া যায়। চিকিৎসার জন্য যদি তাকে ঢাকা যেতে হয়, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায় জেলার বড় বড় হাসপাতালগুলো থাকা সত্ত্বেও সেই অবকাঠামোর পূর্ণ সুফল মানুষ কেন পাচ্ছে না?
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, চিকিৎসাসেবা নিয়ে মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু একটি হাসপাতালের ওপর পড়ে না; পুরো সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপরই পড়ে। তাই অভিযোগ, অনিয়ম বা অব্যবস্থাপনার প্রতিটি বিষয় নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
মানিকগঞ্জের মানুষের দাবি খুব বেশি নয়। তারা চায় নিজ জেলার হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পর্যাপ্ত চিকিৎসক-নার্স এবং জরুরি মুহূর্তে দ্রুত সেবা। তারা চায় না একজন মুমূর্ষু রোগীকে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরতে ঘুরতে শেষ পর্যন্ত ঢাকায় ছুটতে হোক।
তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন মানিকগঞ্জের হাসপাতালগুলোতে জনবল সংকট কবে কাটবে? অকেজো বা অকার্যকর যন্ত্রপাতি কবে সচল হবে? প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ কবে বাড়বে? চিকিৎসকদের কর্মস্থলে উপস্থিতি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানিকগঞ্জের মানুষ কবে নিজ জেলায় উন্নত ও নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাসেবা পাওয়ার নিশ্চয়তা পাবে?
মানিকগঞ্জে স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে এখন শুধু নতুন ভবন বা অবকাঠামো নয়, প্রয়োজন জনবল, যন্ত্রপাতি, জবাবদিহি, নিয়মিত তদারকি এবং রোগীবান্ধব ব্যবস্থাপনা। সরকারি হাসপাতালকে সত্যিকার অর্থে মানুষের হাসপাতাল হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সমস্যাগুলো আর আড়াল করে রাখার সুযোগ নেই।
মানুষের জীবন নিয়ে কোনো ‘রেফার্ডের প্রতিযোগিতা’ নয়, মানুষ চায় সময়মতো চিকিৎসা। সেই অধিকার নিশ্চিত করাই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
লেখক: মো: আকরাম হোসেন. সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক আমার নিউজ।
সম্পাদকীয় | ১ অক্টোবর ২০২৬
মানিকগঞ্জে স্বাস্থ্যসেবার করুণ দশা: রোগী একটু মুমূর্ষু হলেই রেফার্ড করছে ঢাকায়
















